মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিতা হওয়ায় সংসার ভেঙেছিলো বীরাঙ্গণা বিভারাণীর

যুদ্ধের সময় পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন বিভা রানী। আর এই কারণেই তাকে নিয়ে সংসার করতে রাজি হয়নি স্বামী অণুকুল মজুমদার। একসময় ভারতে চলে যান বিভার স্বামী। সে সময় তাদের ঘরে ছিল একমাত্র প্রতিবন্ধী ছেলে সাগর।

স্বামী চলে যাওয়ার পর থেকে সাগরকে নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন বিভা রানী। সংসারের চাকা সচল রাখতে তিনি সেলাইয়ের কাজ করছেন। মাঝে মধ্যে তাকে ধাত্রীর কাজও করতে হয়। জীবনযুদ্ধে প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে বিভা রানীর আরেক সংগ্রাম। বরিশালের গৌরনদী উপজেলার টরকী বন্দরের বাসিন্দা মৃত উমেশ চন্দ্রের আড়াই কাঠা জমিতে টিনের ঘর। এ টিনের ঘরেই একমাত্র ভাই উপেন্দ্র নাথ মণ্ডলকে নিয়ে বিভা রানী সেলাই মেশিন চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

সরেজমিনে বিভা রানীর সাথে কথা বলার একপর্যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আসতেই তিনি অনেকটা আনমনা হয়ে যান। তিনি বলেন,

‘আমার বাবা টরকীরচরে বহুদিন ধরে বসবাস করেছেন। তিনি ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন। এখানে আমরা চার বোন ও এক ভাই ছিলাম। ১৯৭১ সালে আমি টরকী হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। জ্যৈষ্ঠ মাসে এখানে পাকিস্তানি মিলিটারিদের নিয়ে আসে স্থানীয় রাজাকাররা। চারিদিকে আগুন দিতে শুরু করে। লোকজন যে যেদিক পারে ছোটাছুটি করছিলো। আমার বাবা তখন পর্যন্ত বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় সবাই বাবাকে স্থান ত্যাগ করতে বললে বাবা আমাদের নিয়ে পার্শ্ববর্তী কালকিনির রমজানপুরের দিকে ছুটলেন। কিন্তু তখন আমরা দিগ্বিদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরেছিলাম।’

তিনি বলেন,

‘আমিসহ বেশ কিছু মেয়ে (সঙ্গত কারণেই নাম উল্লেখ করা হলো না) আখক্ষেতের মাঠে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে যাই। সেদিন ওদের হাত থেকে আমরা কেউ রেহাই পাইনি। পাশবিক নির্যাতনে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। পরবর্তীতে আমাকে বাবা খুঁজে ঘরে নিয়ে আসে। টরকী বন্দরে এসে আমরা দেখতে পাই বন্দরটি পাকিস্তানি আর্মিরা সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দিয়েছে।’

নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে বিভা রানী আরও বলেন,

‘শ্রাবণ মাসে একই গ্রামের অণুকুল মজুমদারের সাথে আমার বিয়ে দেন বাবা। পরবর্তীতে আমরা দুটি পরিবারের ১০ সদস্য টরকী থেকে নৌকাযোগে আটদিন পর ভারতে পৌঁছে যায়। দেশ স্বাধীনের পর সবাই আবার দেশে ফিরে আসি। দেশে ফিরে আমার স্বামী যুদ্ধচলাকালীন সময়ে আমার ওপর পাশবিক নির্যাতনের কাহিনী জানতে পেরে আমাকে নিয়ে সংসার করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরিমধ্যে আমাদের সংসারে ছেলে সাগর জন্ম নেয়। এর পর সে (অণুকুল মজুমদার) আমাকে ত্যাগ করে ভারতে চলে যায়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে কোন রকম বেঁচে আছি।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে বিভা রানী বলেন,

‘যুদ্ধের সময়ে সম্ভ্রম হারানোর কারণে আমার সংসার জীবন ভেঙে গেছে। আজও সরকারিভাবে আমি কোন সাহায্য সহযোগিতা পাইনি। এমনকি আমার নাম আজও বীরাঙ্গনা হিসেবে মুক্তিযোদ্ধার গেজেটভুক্ত করা হয়নি। অথচ আমার জীবনের করুণ কাহিনী স্থানীয় সকল মুক্তিযোদ্ধারা জানেন।’

 

সৌজন্যেঃ ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *