মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকারীদের এক বিন্দু ছাড় দেয়া যাবেনা : ফরিদ আহমেদ

একটা দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি থাকতে পারে, এটা শুধুমাত্র বাংলাদেশকে দেখলেই বিশ্বাস করা সম্ভব। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ দূর অতীতের কোনো ঘটনা নয়। আধুনিক কালে, নিকট অতীতে ঘটেছে এটি। প্রিন্ট মিডিয়া, অডিও, ভিডিও সবকিছুই তখন ছিল। তারপরেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে এই চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, এর পিছনে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির বিশাল একটা ভূমিকা রয়েছে।

এই পরাজিত শক্তির অন্যতম একটা অংশ বিএনপি নামের একটা দল গঠন করে এর পিছনে আশ্রয় নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি শুরু হয় পচাত্তর সালের পনেরোই অগাস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে খন্দকার মোশতাক গংদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মাধ্যমে। এরা বিএনপির পূর্বসূরী। জাগো দল হয়ে পরবর্তীতে এরাই বিএনপির ছায়াতলে জমায়েত হয়েছে।

একটা স্বাধীন দেশে রাজনীতি করেছে বিএনপি, সে কারণে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থা নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু অন্তরে তারা কখনোই মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে নি। ভাগ্যক্রমে এই দলের প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। তার এই পরিচয়কে ব্যবহার করেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধকে বিকৃতি করার, বিতর্কিত করার প্রথম মিশন। এই ভদ্রলোককে জোর করে এনে বসিয়ে দেওয়া হয় স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে। অথচ যুদ্ধ শুরু হবার আগে, ইনি যে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে এক পাও রাখেন নি, সেটা তাদের মাথায় কাজ করে নি। একটা দেশের মুক্তিযুদ্ধ একজন লোক চোঙা ফুঁকে রাতারাতি শুরু করতে পারে না। এর জন্য লাগে দীর্ঘ প্রস্তুতি, অসংখ্য ধাপ পেরিয়ে একটা গণ আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছে।

এই সেক্টর কমান্ডার ভদ্রলোকই এই দলের প্রতিষ্ঠাতা। রাষ্ট্র ক্ষমতা তিনি দখল করে নিয়েছিলেন বন্দুকের জোরে। এই অপকর্ম করলেও, তিনি নিজে কখনো নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে দাবি করেন নি। এই দাবির অবাস্তবতা সম্পর্কে তার ধারণা পরিষ্কার ছিল বলেই মনে হয়। কিন্তু, তাঁর চেলাচামুন্ডারা এরকম বুঝবান নয়। সূর্যের চেয়ে বালি সবসময়ই উত্তপ্ত থাকে। এরাও তাই। এরাই স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে তাঁকে সামনে নিয়ে আসে। ড্রামতত্ত্বের মতো হাস্যকর তত্ত্বও বাজারে ছাড়ে তারা। তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে নিষিদ্ধ করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। একুশ বছর ধরে রাষ্ট্রের কোনো পর্যায়ে শেখ মুজিবের নাম নেওয়া হয় নি। নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল উপস্থিতিতে। এর পুরোটা সময় বিএনপি যদিও ক্ষমতায় ছিল না, কিন্তু বিএনপির ইচ্ছাকেই এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল স্বৈরাচারী এরশাদের জাতীয় পার্টিও। এরা দলে আলাদা হলেও, চিন্তা-চেতনা এবং বিশ্বাসে সব একই গোয়ালের গরু।

পচাত্তর থেকে ছিয়ানব্বই পর্যন্ত ইতিহাস বিকৃতির স্বর্ণযুগ, মুক্তিযুদ্ধকে অগৌরাবন্বিত করার মোক্ষম সময়। এই একুশ বছরে এরা বিপুল একটা জনগোষ্ঠীর মগজ ধোলাই করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে এই চিন্তা দিয়ে যে, মুক্তিযুদ্ধ মহান কিছু নয়, বিশাল কোনো গৌরবের বিষয় নয়। একাত্তরের ঘাতকদের এরা কোলে তুলে নিয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে, প্রশ্রয় দিয়েছে, এদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়াতে দিয়ে তীব্র অপমান আর লজ্জার মধ্যে ফেলেছে আমাদের।

আগে বিএনপি ইতিহাস বিকৃতি করেছে ঠারে ঠোরে। এখন তাদের মরণদশা। মরণদশায় সাপ নাকি শেষ কামড় দেয়। এরাও তাই দিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় কোন কারণে এটা আমরা সবাই বুঝি। মুক্তিযুদ্ধে তিরিশ লাখ মানুষ মারা গেছে না তিন লাখ মানুষ মারা গেছে, সেটা নিখুঁতভাবে হিসাব করে আমরা কেউই বলতে পারবো না। কিন্তু, এই সংখ্যাকে যখনই চ্যালেঞ্জ জানানো হয়, বলা হয় যে, এটা ভুল সংখ্যা, তখনই আমরা বক্তার মনোভাবটা পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই। খালেদা জিয়ার মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ কতখানি পরিসংখ্যানগত সঠিকতা নিরূপন করা থেকে এসেছে, আর কতখানি তাঁর মুক্তিযিদ্ধের প্রতি অশ্রদ্ধা থেকে, অস্বীকার করা থেকে এসেছে, সেটি বুঝতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না আমাদের। একাত্তরের নয় মাস তিনি পাকিস্তানি সৈনিকদের সাথেই বেশি সংশ্লিষ্ট ছিলেন, যদিও তাঁরা স্বামী তখন মুক্তিযুদ্ধে। পাকিস্তানি মিলিটারির সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানি মানসিকতা দ্বারা তিনি প্রভাবিত হয়েছেন ভালোভাবেই তখন। সেই ভয়ানক প্রভাব এখনো কাটে নি তাঁর, এটা পরিষ্কার।

বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে নোংরা বক্তব্যও একই সূত্রেই বাঁধা। এরা আসলেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে এরা কখনোই ভালবাসে নি, কখনোই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গৌরব বোধ করে নি এরা। মুক্তিযুদ্ধ এদের কাছে গলায় বেধা কাঁটার মতো। না পারে গিলতে একে, না পারে উগড়ে দিতে। পারে শুধু সময়ে সময়ে এর গায়ে বিষ ঢেলে দেবার কাজটি করার।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা হবে, এর সত্য-মিথ্যা আমরা যাচাই করবো গবেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে, কিন্তু একদল লোক এর প্রতি ঘৃণার কারণে দুইদিন পর পর একে অবমূল্যায়ন করে বক্তব্য দেবে, এটা হতে পারে না। এই দেশটা আকাশ থেকে পড়ে নি। নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এর জন্ম। সেই রক্তাক্ত ইতিহাস, সেই নাড়ি ছেড়া সময়ের ঘটনাবলীকে, এর সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষজনকে নিয়ে আজকে এতো দিন পরে এসে কয়েকজন কুলাংগার মানুষ যা ইচ্ছা তাই বলে যাবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যার জন্য যদি ডিনায়াল ল থাকতে পারে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, যার ক্ষয়ক্ষতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তুলনায় খুব একটা গৌণ নয়, তার জন্য কেনো থাকবে না?

দুর্গন্ধময় বিষাক্ত মুখ সেলাই করে বন্ধ করে না দিলে, এদের বিষ নিঃশ্বাসে বাতাস শুধু ভারিই হবে।

মাত্র এক প্রজন্ম আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে সীমাহীন সাহস দেখিয়েছেন, যে দৃশ্যমান দেশপ্রেম দেখিয়েছেন তার তুলনা মেলা ভার। মৃত্যুকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে, তার কোলে মাথা রেখে তারা অনবরত জীবনের গল্প লিখে গিয়েছেন আমাদের জন্যে। একটি অসম যুদ্ধে যে বিপুল বিক্রম নিয়ে তারা লড়েছেন তার তুলনা ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া বিরল। এই সমস্ত অসমসাহসিক বীরদের কথা আমরা প্রায় সময় বলি ঠিকই, কিন্তু কখনোই সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করি না যে ঠিক কীসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাদেরকে, ঠিক কতখানি কষ্টসাধ্য ছিল তাদের যুদ্ধকালীন সময়গুলো, কতখানি জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছিল তাদেরকে বৈরী সময়ে।

ফরিদ আহমেদ
সাবেক মডারেটর
মুক্তমনা বাংলা ব্লগ

একটি দেশকে জন্ম দিতে গিয়ে একাত্তরে কত কত অসংখ্য তরুণ প্রাণ হারিয়েছে এ দেশের কত কত অজানা অচেনা জায়গায়। দেশকে ভালবেসে লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে গিয়েছে কত শত তাজা প্রাণ। তাঁদের শরীরের রক্ত নির্যাস দিয়েই শ্যামল থেকে শ্যামলতর হয়েছে এই ভূখন্ড। এদের রক্ত ঋণে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছি আমরা চিরতরে।

একাত্তরের লক্ষ লক্ষ শহীদ, যারা তাদের সোনালি বর্তমানকে বিসর্জন দিয়েছিলেন আমাদের ভবিষ্যতের জন্য। তাঁদের কথা ভেবেই এই সব পাকিপ্রেমী পংকিল লোকগুলোকে এক বিন্দু ছাড় দেওয়া উচিত না আমাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *