বিজয় এবং একটি বালক : রানা রহমান

বারান্দায় বসে একটা কুকুর অনেক্ষন ধরে কাঁদছে। খুবই করুন সুরে, অনেকটা বিলাপের মতন। সুরে ওঠা নামা আছে এবং ক্রমশ তা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বেশ কয়েকবার দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবার পরও আবার সে একই জায়গায় ফিরে এসেছে। গভীর রাতে কুকুরের এমন কান্না নাকI অলক্ষুণে। সত্যিই অলক্ষুণে কীনা জানিনা তবে আমার ভয় করছে। কেমন গা ছম ছম করা ভয়। এতক্ষন কুকুরটি একাই কাঁদছিল, এখন ওর সাথে যোগ দিয়েছে মহল্লার আরো কিছু কুকুর। এক একটা কুকুর এক এক জায়গায় বসে কাঁদছে। একটা থামার আগেই আরেকটা শুরু করে। সম্মিলিত কান্নার এই সুর এভাবে কলতাবাজার থেকে মইসুন্ডি হয়ে নারিন্দার দিকে ঢেউ এর মতন গড়িয়ে গড়িয়ে যায়। আমার খুব ভয় করে। আজ রোজার সাতাশ। পবিত্র রজনী, মসজিদে তারাবী নামাজ পড়তে যাবার কথা দল বেঁধে। সন্ধ্যা থেকে শহরে কার্ফুর কারনে নামাজ পড়তে যাওয়া হয়নি। আজ যেন সবাই একটু বেশী রকম চুপচাপ। অন্যদিন সন্ধ্যায় রেডিওতে স্বাধীনবাংলা শুনে সবাই। মুক্তিযোদ্ধাদের এগিয়ে আসা নিয়ে ফিস্ফিসানি চলে। চরমপত্র আর খবরটা শুনেই আজ যে যার ঘরে। নানী আর মা আমাদের সবাইকে পালা করে দোয়া দরুদ পড়াচ্ছেন। মার্চ মাসের সাতাশে আমাদের মিরপুরের বাড়ী থেকে পালিয়ে আমরা ঢাকা শহরের একেবারে কেন্দ্রে নানীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। সবাই যখন উদভ্রান্তের মতন শহর ছেড়ে গ্রামের পথে চলেছে, আমরা তখন একটা লাল মোরগ আর খাঁচায় বন্দি একটা টিয়া নিয়ে মামার বাড়ীতে চলে এসেছি। সেই থেকে এক একদিন এক এক ঘরের মেঝেতে ঘুমাই। মামাদের ঘরের মেঝেতে আজ তাড়াতাড়িই আমাদের বিছানা পেতে দেয়ে হয়েছে।

মাঝরাতে চিৎকার চ্যাঁচামেচিতে ঘুম ভেঙ্গে দেখি দুইদিকের দুই দরজা খোলা । বাইরের দরজা দিয়ে একের পর এক কালো পোশাকের মানুষ অস্ত্র হাতে ঘরে ঢুকে আরেক দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে যাচ্ছে। আমাদের চোখের কয়েক ইঞ্চি দূর দিয়ে সারি সারি কালো বুট হেটে যাচ্ছে। মামারা কেউ ঘরে নেই। বুঝতে পারি বাড়িতে পাকিস্তানি আর্মি হামলা করেছে। এরা মিলিশিয়া। উঠানের পেয়ারা গাছটার তলায় ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ চলছে। বড় মামা আর শফিক মামাকে দু’দিক থেকে ধরে রেখেছে দানবাকৃতির দুই সেপাই। একজন মেজর নানা রকম প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছে আর তার ইশারায় অন্য সেপাইরা রাইফেলের বাট দিয়ে মামাদের পায়ে পেটাচ্ছে। কাঠ ফাটার মতন শব্দ। এক একটা আঘাতে মনে হচ্ছে পায়ের হাড় গোড় সব গুড়ো হয়ে যাচ্ছে। তার সাথে শফিক মামার গোঙানি যোগ হয়ে মনে হলো নানীর বাড়িতে নরক নেমে এসেছে। আমরা কীভাবে কখন মায়ের আঁচলের তলায় আশ্রয় পেলাম জানিনা। রান্না ঘরের ভেতরে আমরা, জানালা দিয়ে দেখা যায়না প্রায় কিছুই, কেবল মামাদের আর্তনাদ আর পাকিস্তানি সৈন্যদের গালাগাল কানে আসে। নানী ভালো উর্দু জানেন, ছেলেদের বাঁচাতে তিনি ছুটে গেলেন সেই মেজরের কাছে। হাত জোড় করে, পায়ে পড়ে অনুরোধ করে যাচ্ছেন। মেজরের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই, আয়েশ করে সিগারেট ধরিয়ে বল্লো, চিন্তা করোনা মা- একটু প্রশ্ন করেই ছেড়ে দেব। এদিকে সৈন্যরা সব ঘরে তল্লাশি করতে শুরু করেছে। তছনছ আর ভাঙচুর চলছে সমানে। স্কুলের একটা খাতা নিয়ে বের হয়ে এলো একজন। খাতাটা আমার। সাদা দিস্তার কাগজ কেটে ভাঁজ করে তৈরী। মলাটটাও আমার তৈরী। বাজারে পূর্ব পাকিস্তানের ম্যাপ ওয়ালা খাতার খুব চল, ম্যাপের ওপর একটা যুদ্ধ বিমানের ছবিও থাকে। আমি সেটা হুবহু কপি করেছি। মেজরের কাছে খাতাটা দেয়া হলে সে তা ভালো করে উল্টে পাল্টে দেখে। খুব কষ্ট করে দু এক লাইন পড়তে পারলো, বল্লো এটাতো বাচ্চাদের স্কুলের খাতা। খাতার মলাটের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করা হলে সে খুব মনোযোগ দিয়ে সেটি দেখলো। প্রচ্ছদে পশ্চিম পাকিস্তান নেই, শুধুই পূর্ব পাকিস্তান। তার ওপর যুদ্ধবিমান! সম্ভবত বিচ্ছিন্নতাবাদী ভেবে বসলো। বাঙালী বাচ্চার এত মেধা কেন? সে কোথায় ? আমাকে হয়ত আছড়েই মেরে ফেলবে এই ভয়ে কেউ বললেন সে ঘুমাচ্ছে। মেজর জিজ্ঞেস করলো ওর বাবা কোথায় ওকে নিয়ে এসো। বাবাকে ধরে আনতে হলোনা তিনি নিজেই আড়াল থেকে এগিয়ে গেলেন। খালি গা, লুঙ্গি পরা। শীতের রাতে ঘামছেন। তাঁকে কোন কিছু প্রশ্ন করা হলোনা, জামা গায়ে দিয়ে আসতে বলা হল। জামা গায়ে বাবা ফিরে এলে তাঁকে টেনে হিঁচড়ে বাইরের গাড়িতে তুলে নেয়া হল। পেটানো থামিয়ে দুই মামাকে আগেই গাড়িতে তুলে ফেলা হয়েছে। দস্যুরা চোখের আড়াল হতেই মা আর নানী আছড়ে পড়লেন মাটিতে। মা খালাদের সম্মমিলিত কান্নায়- আহাজারিতে শেষ রাতের হিমেল হাওয়া আরো একটু আর্দ্র হল বোধহয়।

পুরানো ঢাকার সেই পরিচিত সকাল আমার কাছে আজ বড় বেশী নতুন মনে হচ্ছে। বড় বেশী শান্ত চারদিক। খুব সকালে ভাড়ে করে মাঠা বিক্রি করতে আসে যে মাঠাওয়ালা, মাঠাআআ বলে তার ডাকটাকে বড় বেশী সুরেলা আর করুণ মনে হচ্ছে এমন কি কাকের কর্কশ ডাকও যেন আজ বড় বেশী কোমল। নানীর ঘরে মা আর খালারা সবাই কোরান শরীফ নিয়ে পড়তে বসেছেন। এক এক জনের এক এক রকমের উচ্চারনে কেমন এক ধরনের গোঙানির মতন শব্দ হচ্ছে। সকালের আলো ফুটতেই আমার বড় খালা বাচ্চাদের নিয়ে চলে এসেছেন। একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কান্নার পালা চলছে কিছুক্ষন পর পর। পেয়াড়া গাছ তলায় প্রতিবেশিদের ভিড়। সবাই এসেছেন সমবেদনা জানাতে, এই সান্তনা জানাবার ধরনও ভিন্ন। কেউ নানীর সাথে বসে গেছেন কোরান নিয়ে, কেউ এসেছেন সকালের নাস্তা নিয়ে। বাকরখানি, জিলাপি পরটা। নেত্রী টাইপের কেউ কেউ মাকে পরামর্শ দিচ্ছেন এই মুহূর্তের করনীয় সমন্ধে। কেউ বলছেন পীর ফকিরের কাছে যেতে, জানাশোনা পীর আছেন তাঁর অসাধ্য কিছু নাই। ‘কাইল বিহানেই দেখবা ফিরা আইব’। এর মধ্যে একজন বাস্তবমুখি পরামর্শ দিলেন। তাঁর মতে মুসলিম লীগ এবং শান্তি কমিটির নেতা সিরাজুদ্দিন কাছে গিয়ে কান্না কাটি করলে তিনি তাদের ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করলে করতেও পারেন। একমাত্র তিনিই ভরসা। কথাটা মায়ের পছন্দ হোল।

কান্নাকাটি একটু থিতু হয়ে এলে সবাই জানতে চায় কীভাবে কি হল ? একেবারে বিস্তারিত। মামাদের কেন ধরে নিয়ে গেল সেটা মোটামুটি বোঝা যায়। মহল্লায় এই ভাইয়েরা আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী। দেয়াল লিখন আর পোস্টার এখনো যা দৃশ্যমান তা সবই শফিক মামার হাতের কাজ। মুসলিম লীগের কেউ প্রতিশোধ নিতে হয়ত পাকিস্তানিদের খবর দিয়ে এনেছে। রাজাকারে নাম লিখিয়েছে মহল্লার অনেক তরুন তারাই হয়তো কিন্তু আমার বাবার মতন এমন নিরিহ শান্তশিষ্ট ‘মহল্লার জামাই’কে কেন ধরে নিয়ে গেল এরতো ব্যখ্যার প্রয়োজন আছে। আর তখনি আমার মায়ের, খালাদের, নানীর তর্জনী তীরের মতন এসে আমাকে বিদ্ধ করে। ঐযে,ওর জন্য ওর বাবাকে ধরে নিয়ে গেল ! কেন? কী করেছিল এই পুঁচকে বালক ? সেই একই কাহিনী বার বার বর্ণিত হতে থাকে। অতিরঞ্জিত হতে থাকে। আমার প্রতি অবিশ্বাস আর ঘৃণা বর্ষিত হতে থাকে। আমার মায়ের দৃষ্টি থেকে স্নেহ মায়া মমতা মুছে গিয়ে সেখানে আসন গেড়েছে কেবলই ঘৃণা। কাছে গেলে ‘দূর হ’ বলে তাড়িয়ে দেন। আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ মা, তাঁর কাছ থেকে উপেক্ষা আর অনাদর পেয়ে প্রতিদিন আমি একটু একটু করে শামুকের মতন গুটিয়ে যেতে থাকি। এক একবার মনে হয় মরে গেলে হয়। কীভাবে ? সাহস হয়না। বাড়ী ভর্তি এত ছেলে মেয়ে অথচ ওরা আমাকে কেউ পাত্তা দেয় না। আমার কোন বন্ধু নেই। বড় ভাই, ছোট মামা আর খালাতো ভাইদের দলে আমাকে কেউ ডাকেনা। গুলতি দিয়ে বেশ ক’টা চড়ুই মারা হয়েছে, সেগুলো তেলে ভেজে খাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আমার এসব ভালো লাগেনা। আমি আলগোছে বাড়ির বাইরে পা রাখি।

সকালের নরম রোদ এখন বিরক্তিকর তাপ ছড়াচ্ছে । বাড়ী থেকে অনেক দূরে লক্ষিবাজারে চলে এসেছি। এখানে কেউ আমাকে চেনেনা। এক রাতে রাজাকার আর বিহারীদের তাড়া খেয়ে এখানে কোন এক আত্মিয়ের বাড়িতে আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম। ইচ্ছে করেই সেই বাড়ী এড়িয়ে যাই। গলি ঘুপচি প্রায় সবই এক রকম মনে হয় আমার কাছে। এলো মেলো এগলি ওগলি ঘুরে বেড়াই। দুপুর গড়িয়ে যায়। গলির মোড়ে মিউনিসিপ্যালিটির কল থেকে পানি খেয়ে ক্ষুধা তৃষ্ণা একসাথে মেটাই। পথের ধারে দাঁড়িয়ে ক্যারমবোর্ড খেলা দেখি। গনগনে তন্দুরের ভেতর বাকরখানি রুটি বানানো দেখি। বড় মসজিদের নীচে জিলাপি ডালপুরি বানায় খুব কায়দা করে, আমি তন্ময় হয়ে দেখি। একদিন আরো একটু সাহস করে বাহাদুর শাহ পার্ক ঘুরে আসি। সেখানে বাস ট্রাক আর রিক্সার গ্যারেজ আছে। সারাক্ষন হইহল্লা চলছে সেখানে, এর মাঝে একটা ঝুপড়ি ঘরের মধ্যে তৈরী হচ্ছে রিক্সা। আলো আঁধারিতে বসে একজন খুব মনোযোগ দিয়ে ছবি আঁকছে প্লাস্টিকের গদীতে। তাজমহল। পেছনের লাল প্লাস্টিকের ছাউনিতে আঁকা হয়ে আছে উরন্ত ঘোড়া ! মনে হচ্ছে ঘোড়া গুলো এখনই হয়তো উড়ে যাবে কোথাও। মিরপুরে এমন নকশাদার রিক্সা নেই। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে ছবি আঁকা দেখি। গলির মধ্যে মার্বেল খেলে বস্তির ছেলেরা, আমি দাঁড়িয়ে যাই। আমার আসলে কোথাও যাবার তাড়া নেই। তাদের খেলা দেখি। ওদের সাথে খেলতে ইচ্ছে করে। আমার দিকে তারা ফিরেও তাকায় না। ওদের কথা বলা কেমন যেন বিচিত্র ধরণের। প্রতিটা কথার আগে বা পরে খুব বেশী বাজে শব্দ থাকে। গলির মোড়ের কল থেকে পানি নিতে আসা বস্তিবাসী মেয়েরা আরো বেশী গালাগাল করে। সবাই যেন ঝগড়া করার জন্যই কলপাড়ে আসে। শুনতে মজা লাগলেও তাড়াতাড়ি সরে পড়তে হয়। মামাদের কারো চোখে পড়লে রক্ষা নেই। পথে কেউ ফিস ফাস করে যুদ্ধের গল্প করে। গতকালের বোমাটা কারা ফুটিয়েছে, কীভাবে। আমি সব শুনি। চেনা জানা সহজ পথ ছেড়ে অচেনা, নতুন পথ ধরে বাড়ী ফিরি। মা হয়ত উদ্বিগ্ন হন কিন্তু বোঝা যায়না। অন্য সময় হলে মার ধর করতেন নিশ্চিত এখন নিরুদ্দেশ বাবা’র চিন্তায় পুরোপুরি আচ্ছন্ন।

ক্রমশ এই শহরের জীবন যাপনের সাথে একটা নিঃসঙ্গ বালকের শৈশব একাকার হয়ে যাচ্ছে। দিনের প্রায় পুরোটাই আমি বাড়ির বাইরে কাটিয়ে দেই। নারিন্দা,মইসুন্ডি,লক্ষিবাজারের সব অলি গলি আমার চেনা হয়ে যায়। বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে একদিন ফেরার পথে হঠাত কান্নার শব্দে পুরানো এক বাড়ির দরজায় থমকে দাঁড়িয়ে যাই। ভেতর বাড়ী থেকে থেমে থেমে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। দু ‘একজন পথ চলতি মানুষের সাথে আমিও ঢুকে যাই বাড়ীটাতে। চারদিক উঁচু দেয়াল ঘেরা বনেদি টাইপের বাড়ি। বেশ বড় শান বাঁধানো উঠান। কেউ বল্লো হিন্দু বাড়ী। লোকজন তেমন নেই বাড়ীতে, সবাই শহর ছেড়ে পালিয়েছে। উঠানের মাঝখানে একটা চাটাইয়ের ওপর চিৎ হয়ে আছে একটা মানুষের শরীর। এইমাত্র তাঁকে নদির পাড় থেকে তুলে আনা হয়েছে। পাকিস্তানী আর্মি নাকী কিছুদিন আগে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। এর পর আর কেউ তাঁকে দেখেনি। আজ সকালে খবর পেয়ে বুড়িগঙ্গার পাড় থেকে তাঁকে তুলে আনা হয়েছে । শুনে আমার গায়ে কাঁটা দেয়। আমার বাবা আর মামাদেরও তো তুলে নিয়ে গেছে অনেক দিন হলো। তবে কি ওদেরও এমন করে পথ থেকে তুলে আনতে হবে! আতঙ্কে আমার গলা শুকিয়ে আসে। দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর পায়ের ফাঁক দিয়ে আমি শুয়ে থাকা মানুষটাকে স্পষ্ট দেখতে পাই । ফুলে ওঠা শরীরের বুকের কাছে বেশ বড় সড় একটা গর্ত। কয়েকটা মাছি ঘুরছে সেখানে। আমার মাথা ক্যামন করে ওঠে। বমি পায়। দ্রুত পায়ে বাড়ী ফিরি। খাওয়া দাওয়া কিম্বা গোসলের কোন ঠিক ঠিকানা নেই অনেকদিন। আমার অবস্থা দেখে ছোট খালার হয়তো মায়া হয়। কূয়ার পাড়ে দাঁড় করিয়ে মাথায় এক বালতি পানি ঢেলে গোসল করিয়ে দেন। রান্না ঘরে পিঁড়ি পেতে খেতে দেন। আমি চোখের জল আড়াল করে খেয়ে উঠি। কাউকে আর বলা হয়না আজ আমি কী দেখে এসেছি।

বাবা আর মামাদের ধরে নিয়ে গেছে অনেক দিন হল। কোথাও তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ বলছে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেছে, কেউ বলছে সেকেন্ড ক্যাপিট্যালে আর্মিরা নতুন ক্যাম্প করেছে, হয়তো সেখানেই। সেটা কোথায় আমি জানিনা, তবে শুনেছি ওখানে নিয়ে গেলে কেউ আর ফিরে আসেনা। মা আর নানী এক মাজার থেকে আরেক মাজারে ঘুরে ফিরছেন। যে যা বলছে তাই করছেন। সদকা, মানত এসবের কোন হিসাব নিকাশ নেই। শান্তি কমিটির সিরাজুদ্দিনের কাছেও ধর্না দেয়া হয়েছে বার কয়েক কিন্তু কোন তথ্যই মিলছেনা। তাঁরা বেঁচে যে আছেন সেটাই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। আমি এলো মেলো ঘুরে বেড়াই এ গলি থেকে সে গলি। কাজীবাড়ির মসজিদের দেয়াল ঘেঁষে পারিবারিক কবরস্থান। দিনের বেলাতেই কেমন গা ছম ছমে পরিবেশ। আমার বয়েসি কেউ এখানে আসেনা, আমি প্রায়ই আসি। চুন সুড়কীর পুরানো দালানের ছাদে, ক্ষয়ে পড়া ভাঙ্গা কার্নিশে, মোটা দেয়ালের ফাঁকে গজিয়ে ওঠা বট আর অশ্বথ গাছের তলায় মনোরম ছায়া। স্যাঁতসেতে ছাদে উপুর হয়ে শুয়ে আমি কালো পিঁপড়ের মিছিল দেখি। সবাই খুব ব্যস্ত হয়ে ছুটাছূটি করছে। আমাকে নিয়ে তাদের কোন আগ্রহ নেই। আমার খুব কান্না পায়। আমি চিৎ হই। পুরানো ঢাকার ইলেক্ট্রিকের তারের জটিল হিজিবিজির মধ্যে আমার মিরপুরের অবারিত আকাশ ক্রমশ হা্রিয়ে যায়। তারে ঝুলে থাকা রঙিন কাটা ঘুড়ির সাথে মরা বাদুড় বাতাসে দোল খায়।

একদিন হঠাত খবর এলো বাবা আর মামাকে দেখা গেছে। তাঁরা এখনো বেঁচে আছেন শুনেই মা আর নানী জায়নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাতে। জানা গেল সেকেন্ড ক্যাপিট্যালের সেই কুখ্যাত টর্চার সেলেই ছিলেন তাঁরা, ক’দিন আগে বাড়ির কাছের ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে নিয়ে আসা হয়েছে। এখানে নাকী অত্যাচার করেনা। খুব শিগগিরি হয়তো ছেড়ে দেয়া হবে , তাই এখানে নিয়ে আসা। শফিক মামা’র কোন খবর নেই। নানী’র বাড়ির কাছেই সেন্ট্রাল জেল। মা আর নানী জেলের গেটে বসে থাকেন ঘন্টার পর ঘন্টা। যদি প্রিয় জনের একটু দেখা কিম্বা খবর শোনা যায় এই আশায় শহর গ্রামের দূর দুরান্ত থেকে মানুষ এসে বসে থাকে বিশাল ঐ দরজার সামনে। এদের সিংহভাগই নারী। মধ্য বয়েসি। তাঁরা আসে হাতে ছবি নিয়ে, স্বামী পুত্র ভাই প্রিয়জনের ছবি। কেউ যদি চিনতে পেরে একটা খবর দেয়। অশ্রুসিক্ত চোখ আর ভাঙ্গা শরীরের সেই মানুষগুলোর বেশীরভাগই ফিরে যায় কোন খবর না নিয়েই। মুসলিম লীগের এক নেতার কাছ থেকে ‘বিশেষ পাস’ জোগাড় করে একদিন বাবা আর বড় মামার সাথে সত্যি সত্যি দেখা করে এলেন মা আর নানী। জানা গেল তাঁরা সুস্থ্য আছেন। শফিক মামার খবরও পাওয়া গেল তাদের কাছ থেকে, ঐ জেলেই আছেন। দূর থেকে নাকী ইশারায় কথাবার্তাও হয়েছে বার কয়েক।

নয় ডিসেম্বর সকাল বেলায় কোন রকম পূর্বাভাস ছাড়াই বড় মামা আর বাবা বাড়ী ফিরে এলেন। যথারীতি আমি বাড়ির বাইরে, ফিরে এসে অনেক দিনের না কামানো দাড়ি গোঁফ এবং ঝাকড়া চুলে বড় মামা আর বাবাকে দেখে খুব অচেনা লাগে। কাছে যেতে ভয় হয়। মা আর নানী তাঁদের ঘিরে রেখেছেন এমন করে যে আমরা ছোটরা কেউ তাঁদের কাছে ঘেঁষার সুযোগ পাই না। প্রতিবেশী আর আত্মীয় স্বজনদের সাথে কথপোকথনের সময় তাঁদের উপর কী অমানুষিক অত্যাচার করা হয়েছে তার খানিকটা বিবরণ আমরা পাই। ঘুরন্ত ফ্যানের সাথে দুই হাত বেঁধে নাকী ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল বড় মামাকে! একবার গায়ের শার্ট খুলে মা’কে তাঁর পিঠ দেখানোর সময় আমি সেখানে ছিলাম। সমস্ত পিঠ ইলেক্ট্রিক তারের চাবুকের আঘাতে জর্জরিত। দেখে শিউরে ঊঠেছি। তুলনায় বাবাকে নাকী কম অত্যাচার সইতে হয়েছে। নির্যাতনের কারনে তাঁদের দুজনের শরীরের অবস্থা যে খুবই খারাপ সেটা বাইরে থেকেই বেশ বোঝা যায়। মামা আর বাবা খুব দ্রুত সেরে উঠছেন কিন্তু বড় বেশী চুপ চাপ দুজনেই। কথা বার্তা প্রায় কারো সাথেই তেমন বলেন না, দুজনেই মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখে এসেছেন। হতে পারে বেঁচে যে আছেন এই বিস্ময়বোধই তাঁদের কাটছেনা। এদিকে শফিক মামা’র আর নতুন কোন খবর পাওয়া যাচ্ছেনা। কেউ কিছুই জানে না। শোনা যাচ্ছে তাঁকে আবার সেকেন্ড ক্যাপিটালের সেই টর্চার ক্যাম্পে নিয়ে গেছে। দ্বিতীয়বার গিয়ে ওখান থেকে কেউ ফিরে এসেছে এমন কেউ শোনেনি। এক সময় নিশ্চিত খবর এলো, সম্প্রতি জেল থেকে ফেরা কেউ একজন মামাকে দেখে এসেছেন সেন্ট্রাল জেলেই। তাঁকে মুক্ত করার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি দেখাও করা যাচ্ছে না।বাইরে গোলা গুলি আর ধর পাকড় চলছে সমানে। আগে শুধু রাতের বেলায় গুলির শব্দ শোনা যেত এখন দিনের বেলাতেও গুলি আর বোমার শব্দ শোনাযায়। রাতের বেলায় খুব কাছেই বোমা ফাটে। বড় মামা আর বাবা আবার ব্যস্ত তাঁদের সেই এক ব্যান্ডের রেডিও নিয়ে । আকাশবাণীর দেব দুলাল বন্দোপাধ্যায় আর স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের এম আর আখতার মুকুল তাদের দু’জনের কাছে ঈশ্বরসম । কথপোকথনের ফাঁকে বড় মামা খুব কায়দা করে চরম পত্রে’র সংলাপগুলো ব্যবহার করেন। তাঁদের চোখ চক চক করে। যুদ্ধের ঝাঁজ খুব স্পষ্ট বোঝা যায়।


বাবা ফিরে আসার পর আমার ভবঘুরে জীবনের রাশ টেনে ধরা হয়েছে। বাড়ীর বাইরে যাওয়া বন্ধ। এখন ছাদে যাই। পুরানো ঢাকার বাড়িগুলো সব খুব কাছাকাছি, এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে যেতে শুধু সাহস করে একটু লাফালেই হয়। বোকাট্টা ঘুড়ি ধরতে এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে বাদরের দক্ষতায় ছুটে যাই। ঘুড়ি ধরতে যেয়ে একদিন দেয়াল থেকে পড়ে হাত ভেঙ্গে গেল। আমাকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে গেলেন মা। হাতে প্লাস্টার করার ফাঁকে আমি এদিক সেদিক চোখ বুলাই। প্রচুর আহত মানুষ সেখানে, সবই বিহারী ওরা এসেছে কুষ্টিয়া থেকে। মুক্তিযোদ্ধারা একটা যাত্রিবাহী ট্রেনে বোমা মেরেছে, এরা সেই ট্রেনের যাত্রী। বাড়ী ফিরে মা সবাইকে ফিস ফিসিয়ে সেই গল্প বলছে আর তাতে সবাই কী যে খুশি। ১৪ ডিসেম্বর দুপুর বেলায় আচমকা ঢাকার আকাশে ভারতীয় বিমান চলে এলো, প্রেসিডেন্ট ভবনে বোমা ফেলে গেল। আমরা ছাদে দাঁড়িয়ে কালো ধোয়ার কুন্ডলি দেখি। সেদিনই ছাদে ওঠার স্বাধীনতাটা গেল। আমরা জানালা দিয়ে আকাশে ভারতীয় বিমানের কলাকৌশল দেখি। সবাই বলাবলি করছে যুদ্ধ শেষ হয়ে এলো বলে। মধ্যরাতে চিৎকার আর কান্নার আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে যায়। পাশের বাড়ী থেকে সাংবাদিক নিজামুদ্দিনকে আলবদররা ধরে নিয়ে গেল। এরকম প্রায়ই হচ্ছে এখন। বেছে বেছে ভাল লোকগুলোকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। মহল্লার কিছু তরুন রাজাকারে নাম লিখিয়েছে শুনেছি। আলবদর আর আলশামস নামেও দুটো দল আছে। ওরা আরো বেশী হিংস্র এবং নির্মম। শুনি ওরা মহল্লা পাহারা দেয়। শান্তি কমিটিও খুব তৎপর এলাকার শান্তি রক্ষায় !

 

১৬ ডিসেম্বর। আর সব সকালের মতই শীতের সকাল। হালকা কুয়াশার চাদরে ঢেকে সূর্য ওঠে আর দিনগুলোর মতই। মাঠাওয়ালার সুরেলা আওয়াজ পুরানো ঢাকার শ্যাওলা ধরা দেয়াল গুলোকে আর বেশী আর্দ্র করে দেয়, গড়িয়ে গড়িয়ে যায় গলির এমাথা থেকে ওমাথা। গতকাল সারা রাত ধরে চলা প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দ এখন থিতিয়ে এসেছে, দূর থেকে কিছু গুলির শব্দ ভেসে আসে। বাকরখানির দোকান গুলো ঝাপ খুলে তৈরী হচ্ছে সকালের নাস্তার যোগান দিতে। নিরাভরন এক সকাল। বিকেলের দিকে এই চেনা জানা সকালের বিপরিত এক সময় এসে হাজির হয় আমাদের সামনে। অচেনা এক সময়। হঠাত করেই চিৎকার করে ঊঠে কিছু মানুষ। আর্তনাদ আর আহাজারী শুনে অভ্যস্ত কানে আনন্দের এই চিৎকার বড় অচেনা লাগে। ধোলাই খালের দিক থেকে সোল্লাস চিৎকারটা এসে পৌঁছানোর সাথে সাথে কে একজন রেডিওতে স্বাধিনবাংলা ধরলো উঁচু ভলিউমে। ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ বাংলার ঘরে ঘরে’ স্বাধীনতার গান বাজছে। দেশ স্বাধিন হয়ে গেছে, কেউ চিৎকার করে জানালো। সারাদেশ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকা শহরের দিকে ছুটে আসছে। আতসবাজির মতন শব্দ করে ফুটছে সব মারনাস্ত্র। বাঁধভাঙ্গা আনন্দে মানুষ ঘরের বাইরে বের হয়ে আসছে। সযত্নে লুকিয়ে রাখা বাংলাদেশের পতাকাগুলো গর্বিত ভঙ্গিতে সারা শহর ঘুরে বেড়াচ্ছে। শহরের সব গুলো রেডিওতে বাজছে স্বাধিনবাঙলা বেতার কেন্দ্র’র দেশাত্মবোধক গান। এতদিন যেসব গান আমরা শুনেছি লেপের

তলায় ভলিউম কমিয়ে, আজ সেসব গান হচ্ছে মাইকে। আব্দুল জব্বার গাইছেন, ‘হাজার বছর পরে আবার এসেছি ফিরে বাংলার বুকে আছি দাঁড়িয়ে’। সে এক অবাক করা আনন্দ জোয়ার। আমাদের যাদের বাইরে বের হবার উপায় নেই তাদের জন্য আছে ছাদ। আমরা ছাদে দাঁড়িয়ে দেখি ধোলাই খালের রাস্তা দিয়ে পাকিস্তানি মিলিটারি কনভয় ফিরে যাচ্ছে। বৃষ্টির মতন আকাশে গুলি ছুড়ে যেমন আনন্দ করছে মুক্তিযোদ্ধারা , পালিয়ে যাবার সময় পাকিস্তানিরাও এলোমেলো গুলি ছুড়ছে। বাইরে থাকা মোটেও নিরাপদ নয়। আমরা নেমে আসতে বাধ্য হলাম। বাড়ির এক ছেলেকে জেলে রেখে আমাদের বাড়িতে স্বাধীনতার আনন্দ ঠিক জমে ওঠেনা।

১৭ ডিসেম্বর সকালে হঠাত মিছিলের শব্দে ছুটে গলির মুখে যাই। দেখি ছোট খাট একটা মিছিল আমাদের বাড়ির দিকে আসছে। শফিক মামাকে তাঁর সব বন্ধুরা কাঁধে করে বাড়িতে নিয়ে আসছেন। বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা, যারা হয়তো আজই রনাঙ্গন থেকে ফিরে যাচ্ছেন তাদের নিজ নিজ ঘরে তারাও যোগ দিয়েছেন এই মুক্তির আনন্দে, স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে। আক্ষরিক অর্থেই জেলের তালা ভাঙ্গা হয়েছে। সেই জেল গেট থেকেই তাঁরা এই মিছিলের সাথে আছেন, তাদের হাতে ঝক ঝকে স্টেনগান, কারো গলায় বুলেটের মালা, হাতে গ্রেনেড। দীর্ঘ দিনের না কাঁটা চুল দাড়িতে এক এক জনকে সন্যাসীর মতন লাগে। এতসব নিষিদ্ধ বিষয় এক সাথে দেখে আমার আর বিস্ময়ের ঘোর কাটেনা। মুক্তিযোদ্ধা, অস্ত্রসস্ত্র না মামা; কাকে রেখে কাকে দেখি। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের তিন রঙা পতাকা মামার মাথায় জড়ানো। দুদিকে দু’হাত ছড়িয়ে তিনি যেন ভাসতে ভাসতে এগিয়ে আসছেন। তাঁর মুখ জুড়ে বিব্রত হাসি। ক্ষুধা তৃষ্ণা আর অত্যাচারে জর্জরিত অথচ কী অমলিন হাসি। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এই মুক্তির আলাদা একটা উজ্জলতা আছে। পেছনে অনেক মানুষ। অধিকাংশই এই মহল্লার মানুষ। মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা বাড়ির দরজায় পউছেই আকাশের দিকে তাদের স্টেনগান থেকে এক ঝাক গুলি ছুড়লেন। মামার বীরোচিত আগমনবার্তা। সে এক অদ্ভুত অবস্থা, গুলির শব্দে কেউ আতঙ্কে ছুটে পালায় তো কেউ উল্লাসে চিৎকার করে। বাড়ীতে ঢুকতেই সকালে গোয়ালার দিয়ে যাওয়া এক জগ দুধ নানী তাঁর ছেলের মাথায় ঢেলে দিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে ছেলেকে বিপদ্মুক্ত ও পবিত্র করে এখন স্বস্তির কান্না। জাদরেল মায়ের কান্না দেখার মতন দুর্লভ সুযোগ বেশিক্ষন পাওয়া গেলনা। গুরুজনদের কোন রকমে সালাম করেই সেই মিছিল আবার পথে নামলো।

এবার ভোজবাজির মতন কোত্থেকে যেন মিলিটারীর একটা খোলা জীপ জোগাড় হয়ে গেল। বেশ কয়েকটা পতাকা লাগানো হলো ওতে। আনন্দ মিছিলে গতি এলো ঠিকই কিন্তু আমরা হয়ে গেলাম আরো বেশী অসহায়। জীপে সেই মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মামাকেও নেয়া হয়েছে, উঠেছে নেতা টাইপের কিছু মানুষ। সেখানে আমাদের যায়গা হবার কথা নয়। আমরা ক’জন বালক জীপটাকে ছুঁতে পারার আনন্দেই আত্মহারা। মিছিল চলছে পুরানো ঢাকার অলিগলি দিয়ে। আমরা জীপের যতটা কাছে থাকা সম্ভব তার চেষ্টায় ব্যস্ত। জয়বাংলা শ্লোগানের সাথে সাথে জীপ থেকে আকাশে গুলি ছোঁড়া হচ্ছে অবিরাম। কান ফাটানো ভয়ঙ্কর সেই শব্দে মানুষ ভয় পাবে কী আরো উল্লাসে ফেটে পড়ছে। রাস্তার পাশে সকালের রোদেলা আড্ডা দেয়া বুড়োর দল ছুটে এসে জড়িয়ে ধরছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। এই শীতের সকালে এই সব অগ্নিপুরুষদের আলিঙ্গন করে ওরা যেন তাদের সব টুকু উষ্ণতা নিজেদের দেহে ধারণ করতে চইছেন। রাস্তার মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এগিয়ে এসে মিছিলের আকার দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করে তুলছে। যা ছিল অল্প কিছু মানুষের মুক্তির মিছিল সেটা ক্রমশ বড় হতে হতে রূপ নিয়েছে সর্বস্তরের মানুষের বিজয়ের আনন্দ মিছিলে। রোকনপুর, বাহাদুর শাহ পার্ক আর রায় সাহেব বাজার হয়ে নবাবপুরের দিকে মিছিল এগোতেই দেখি মামা হাত নেড়ে, চিৎকার করে আমাকে বাড়ী ফিরে যেতে বলছেন। তিনি জানেন আমার পৃথিবী কতটা প্রসস্থ। এর বাইরে গেলে আমি যে হারিয়ে যেতে পারি- আনন্দ মিছিলের এই উন্মাদনার মধ্যেও মামার মনে আশঙ্কা। কিন্তু আমি যে এখন নেশাগ্রস্থ এক বালক। পুরো জাতিকে মুক্তির আলোয় অভিষিক্ত করেছেন যারা সেই সব আলোর দিশারী আমার সামনে, আমার আর হারিয়ে যাবার ভয় কি! ছুটন্ত আমার পায়ের তলায় একে একে পিছিয়ে যেতে থাকে শহরের সব অলিগলি, রাজপথ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *