চুরির কোন সহনীয় মাত্রা নেই মন্ত্রী মহোদয় : আরিফ জেবতিক

১. মানবিকতা, সম্মান এসব কীভাবে পদে পদে পদদলিত হয় তা জানতে হলে আপনাকে একজন বেসরকারি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে অনুসরণ করতে হবে। অবসরে যাওয়ার পরে তাঁদের অবসর ভাতা পাওয়ার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। না, দিনের পর দিন নয়, মাসের পর মাস নয়-বছরের পর বছর। সারজীবন মাথা উঁচু করে চলা বৃদ্ধ শিক্ষকদেরকে নাতির বয়সী কর্মচারিদের টেবিলে টেবিলে হাতজোড় করতে করতে জীবনীশক্তি খোয়াতে হয় প্রতিটি দিন। এভাবে ভাগ্যে থাকলে ৪/৫ বছর পরে হয়তো পেনশনের টাকা পাওয়া যায়, কিন্তু সে টাকাও নিতে হয় অনেক ছল করে। আবেদনপত্রে লিখতে হয় হজ্বে যাব নয়তো লিখতে হয় মেয়ের বিয়ে আটকে আছে-তাহলেই যদি বিশেষ বিবেচনায় পেনশনের শিকে ছিড়ে!
এই মানবিক বিপর্যয় ঘটে চলছে এমন এক দেশে, যে দেশকে মধ্যআয়ের দেশ বলে আমরা নিজেদের পিঠ চাপড়াই অহরহ।

২.’ডেমগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ অর্থাৎ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধির ম্যাজিকে এই দেশ প্রবেশ করেছে ২০০৭ সাল থেকে। ২০৪০ সাল পর্যন্ত এই দেশ থাকবে তারুণ্য নির্ভর। এই সময়ের তরুণদের যদি ঠিক মতো তৈরি করে দেয়া যায়, এই দেশ আগামী শতাব্দীর নেতৃত্ব দানকারী দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে-এই ব্যতয় হওয়ার উপায় নেই। অথচ ১০টা বছর কেটে গেছে, তারুণ্যের শিক্ষায় আসেনি বিপ্লব। বরং একটা পুরো জেনারেশনকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁস আর মুড়িমুড়কির মতো জিপিএ বিতরন করে। গ্রামের স্কুলগুলোতে টিনে চালে পানি পড়ছে, আর স্বঘোষিত চোরেরা আছে স্কুলে এসকেলেটর সিড়ি বানানোর প্রজেক্ট পাস করার ধান্দায়। সর্বস্তরে স্কুল ফিডিং চালু করা যায় নি তাই গরীব মানুষের বাচ্চারা দলে দলে যাচ্ছে লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের মাদ্রাসায়। তৈরি হচ্ছে জাগতিক স্কিল বিহীন এক বিরাট জনগোষ্ঠি।

৩. পাঠ্যপুস্তকগুলো অহরহ বদলে যাচ্ছে। বাদ পড়েছেন রবীন্দ্রনাথ, লালন, হুমায়ূন আজাদ। পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তনে অভিনন্দন জানাচ্ছেন তেতুল বাবা।


কিছু কিছু চোর আছে যারা আপনার ল্যাপটপ- মোবাইল-মানিব্যাগ চুরি করে। এগুলো চুরি গেলে সাময়িক ক্ষতি হয়।
কিন্তু কিছু কিছু চোর সুকৌশলে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে এই দেশের ভবিষ্যত। এই দেশের একমাত্র ভবিষ্যত, ডেমগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এর রহমত, যা চুরি হলে আবারও এই জাতিকে ধুকতে হবে শতাব্দীর পর শতাব্দী।

আরিফ জেবতিক
ব্লগার, সাংবাদিক

প্রিয় শিক্ষামন্ত্রী, পুরো জাতির ভবিষ্যত চুরির এই যজ্ঞে কোনো সহনীয় মাত্রা নেই।
আমরা আপনাকে চাই বেসরকারি শিক্ষকদের পেনশনের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে, আমরা আপনাকে চাই স্কুল ফিডিং চালু প্রয়োজনে রাস্তায় ভিক্ষা করতে, আমরা আপনাকে চাই প্রশ্নফাঁস বন্ধে ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে।
আমরা কোনো সহনীয় মাত্রার চোরের চমক লাগানো বাক্য শুনে ভুলে থাকতে চাই না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *