কুয়োভাদিস বাংলাদেশ। চলেছো কোন পথে?: হিল্লোল দত্ত

সেই তো ফলছে তেমন, যেমনটা কথা ছিলো।

নাস্তিকহননের নামে দশ মাস আগে ঘাতকের নিশিত চাপাতির আঘাতে লুটিয়ে পড়লেন অভিজিৎ রায়, সেটা ছিলো প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে চুয়াল্লিশ বছরের যাত্রার ফলাফল। সেটা ছিলো দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রেতাত্মার, সাম্প্রদায়িকতার মুখোশঢাকা হাসিমুখের, চিন্তা ও বলার স্বাধীনতাহরণের পাকিস্তানিকরণেরই ধারাবাহিকতা। সেটা ছিলো শতকের পর শতক ধরে ধর্মীয় মৌলবাদের তোষণ, পোষণ ও মৌন সমর্থনের পরিণাম। সেটা ছিলো মুক্তচিন্তার বিপরীতে দেড় হাজার বছরের পুরনো মতাদর্শের লড়াইয়ের ফলেন কমরেডের লাল সারি। সেটা ছিলো চাপানো অন্ধ টোটালিটারিয়ান কর্তৃত্বপরায়ণ ডগম্যাটিক শান্তির নামে শীতল হিংস্রতার আধুনিক বাস্তবায়ন। সেটা ছিলো স্রেফ শুরু একটা তুমুল তীব্র তীক্ষ্ণ তর্কাতীত অন্ধকারের সহস্র বর্ষের দিকে সবিরাম যাত্রার।

আর এই দশ মাসে আমরা ক্লান্ত চোখে, হতাশ কপালে, ব্যর্থভগ্ন হৃদয়ে, বিস্ময়াতীত বুকে, নির্বীর্য স্বাভাবিকতায় আর প্রতিবাদহীন আত্মরক্ষায় দেখে গেছি অনলাইন আর অফলাইনে অগণিত অমানুষ, প্রেত, পিশাচ, রাক্ষস, রক্তচোষার অবিরল বমন। কেউ ধর্মের দোহাই টেনে, কেউ নিরাপত্তার ছদ্ম ভয় জাগিয়ে, কেউ একাডেমিক জার্গনের আড়ালে, কেউ তর্কবিতর্কের ছলে আড়াল করতে চেয়েছে, সমর্থন করেছে, দায়মুক্ত করেছে এসব নৃশংস, মগজপচা, বিবেকবোধহীন, ধর্মপরায়ণ খুনি চাপাতিবাজদের। আওয়ামী-বিএনপি-জামাত-বাম সমর্থক-দলান্ধ-কর্মী-বাহুবলীরা একাট্টা ছিলো অনেকেই এসব পথে। রাষ্ট্র মুখ ফিরিয়েছে, প্রশাসন প্রসব করেছে অশ্বডিম্ব, তদন্ত আরব্য মরুতেই সম্ভবত মুখ থুবড়ে পড়েছে, জনতার জিহাদি জোশ হয়েছে প্রবলতর, আস্কারা পেয়েছে মৌলবাদীরা, সহাস্য সঙ্কেতও সম্ভবত।

আর একের পর এক তরুণ চেহারা রক্তাপ্লুত লাশঘরে এসেছে, কোপে প্রাণহানি ঘটেছে ধর্মযাজকেরই খোদ, বোমা পড়েছে কাদিয়ানি-শিয়া-সুন্নির প্রার্থনাঘরে। শুক্রবার হয়ে উঠেছে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মতোই আতঙ্কগ্রস্ত, ভয়জাগানিয়া, শিহরক এক প্রেতপুরী, ভ্যাম্পায়ার লেয়ার, জোম্বিল্যান্ড। নাস্তিকদের উইচহান্টিঙের পালে হাওয়া যুগিয়েছে রাষ্ট্রের কর্ণধার, শক্তিমান, দায়িত্ববানদের কথা বা নীরবতা। দলদাসেরা নানাভাবে নিহতদের দায় খুঁজে, তাদের গালি দিয়ে, তাদের ত্রুটি আবিষ্কার করে তাদের মৃতদেহ ও ক্রমহনন সুলভতর করেছে। বুদ্ধিজীবীমহলের মেরুদণ্ডহীন আত্মপ্রতারণা আর মিডিয়ার খবরবেশ্যাপনার আড়ালে মানুষের ভরসার, লড়াইয়ের, প্রতিবাদের, প্রতিরোধের, জাগরণের অঙ্কুরগুলো শুকিয়ে গেছে। ভয়ভীতিভাবনামুখর সময়ে ও পরিবেশে তারুণ্যের ও প্রগতির পরিব্রাজকদের পথচলা লুপ্ত বা অদৃশ্য।

আজ, বর্ষশেষে এটুকু সুস্পষ্ট যে, যেসব শঙ্কার কথা, আতঙ্কের কথা, হতাশার কথা উচ্চারণ করে সবাইকে সচেতন, একত্র, প্রতিরোধী করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছিলো, প্রায় সবই ব্যর্থ হয়েছে। পতনের পিচ্ছিল, অনিবার্য আর নিঃসংশয়ী পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ-জাতি-ভবিষ্যৎ।

তবে কি আশা নেই, উত্তরণ হবে না, মুক্তি আসবে না!

হবে।

কিন্তু, ক্ষুধিত পাষাণের সেই বন্দিপুরি আর বন্দিনীর মুক্তির উপায়ের মতোই তা বড় দুরূহ, দীর্ঘমেয়াদি আর অজস্র কাঁটায় পরিপূর্ণ।

সমমুখী, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জাগরী শিক্ষার ব্যবস্থা করা, প্রশাসনে দুর্নীতি, ক্ষমতাদর্প, শৈথিল্য দূর করা, বাঙালি সাহিত্যসংস্কৃতিভাষাচর্চায় উদ্বুদ্ধ করা সববয়েসিদের, সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ও বিসমিল্লাহ হটিয়ে সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজন্ম গড়া, নৈতিকতার (ধর্মীয় নয়) শিক্ষাপ্রদান ও পালনের ব্যবস্থা করা ও ভঙ্গের শাস্তিবিধান করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুবিধেবঞ্চিতদের সুব্যবস্থা পৌঁছানো যেন তারা মৌলবাদের গ্রাসে না-পড়ে, এমনি কতশত কাজ।

কুয়ো ভাদিস, বাংলাদেশ?

চলেছো কোন পথে?

রক্তনদী বইয়ে প্রায়শ্চিত্তের চরম আরমাগেড্ডনের দিকে যাওয়ার আগে ফিরে তাকাবে না একবার?

একাত্তরই যে বৃথা যাবে নইলে!

ওহ, অভিদা, দিনে দিনে বোঝা বেড়েছে আর প্রতি পদেপলে অভাব অনুভব করেছি আপনার।

দশটা মাস হলো, এই অভিশপ্ত বছরটাও কেটে গেলো, কোনো আশা এলো না, শুধু অন্ধকার অমাবস্যা, শুধু ছায়া কালো কালো, শুধু বাংলাস্তানের দিকে ইগজোডাস…

আমি বেরুতে পারবো কবে এই চক্রব্যূহ থেকে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *